25 C
Kolkata
Thursday, December 1, 2022
বাড়িসম্পাদকীয়ভারতের স্বাধীনতা কবে !!!

ভারতের স্বাধীনতা কবে !!!

১৪ না ১৫ ই আগস্ট !! ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার আসল ইতিহাস ।।

ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার দিন

১৪ই আগস্ট‚ ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার দিন। ১৫ই আগস্ট‚ পাকিস্তানের স্বাধীনতা পাওয়ার দিন।

না‚ একদমই ভুল পড়ছেন না। আসলেই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৫ই আগষ্ট‚ আর হিন্দুদের দিন গননার পদ্ধতি অনুসারে (এবং সেই দিকেই লক্ষ্য রেখে) ভারতের স্বাধীনতা দিবস ছিলো ১৪ই আগষ্ট!

গুছিয়েই বলি বরং।

আগে থেকেই ঠিকঠাক হয়ে গেছিলো যে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশরা ক্ষমতা ছাড়বে ১৫ই আগষ্ট‚ ১৯৪৭এ। দিনটি ঠিক করেছিল মাউন্টব্যাটেন স্বয়ং। সম্ভবত এশীয় পরাশক্তি জাপানের আত্মসমর্পণের দিনেই ভারতের স্বাধীনতার দিন ঠিক করেছিলেন তিনি। ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক লা পিয়েরের লেখা ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইটে’ বলা হয়েছে, মাউন্টব্যাটেন নিজেই স্বাধীনতার তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। তবে তাকে এই তারিখের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে, সেভাবে কোনো সুস্পষ্ট জবাব দেননি।

তবে তা যেকারনেই হোক‚ কংগ্রেস, ব্রিটেন, মুসলিম লীগ তিন পক্ষই এই দিনের ব্যাপারে সহমত ছিলো‚ কারওই কোনো অসুবিধা ছিলো না।

একইসাথে স্বাধীনতা পাচ্ছে দুই দেশ

কিন্তু‚ এরইমধ্যে একদিন ক্যালেন্ডারের দিন দেখতে গিয়েই ভারতীয় নেতাদের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হলো। একি? ১৫ই আগষ্ট তো পড়েছে শুক্রবার‚ যা কিনা মুসলমানদের পবিত্র দিন‚ জুম্মাবার! একইসাথে স্বাধীনতা পাচ্ছে দুই দেশ‚ পাকিস্তান স্বাধীনতা পাবে তাদের পবিত্র দিনে‚ অথচ ভারত কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবে?

তা কি কখনো হয়? অতএব‚ পাল্টাও দিন।

কিন্তু পাল্টাও বললেই কি পাল্টানো যায়?
জিন্নাও এতদিন আহ্লাদে আটখানা হয়ে আছে‚ জুম্মাবারে আজাদী আসছে! এখন দিন পাল্টালেও সেও বা শুনবে কেন? যা কাঁচাখেকো মাল‚ হয়তো আবার ইসলাম বিপন্ন বলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা – গণহত্যা শুরু করে দিলো। কান মে বিড়ি‚ মুহ মে পান / লড়কে লেঙ্গে জুম্মাবার!

ফলে স্বাধীনতা পাওয়ার দিন নিয়ে আবার একটা ক্যাচাল বাঁধার উপক্রম হলো! আর স্বাভাবিক এটা! প্রত্যেক জাতিই চায়‚ তাদের কোনো বিশেষ দিন তাদের ইতিহাস – ঐতিহ্য -সংস্কৃতি মেনেই হোক‚ অন্যের না! ভারত -পাকিস্তান দুই দেশই সেটাই চাচ্ছিলো। কাউকেই দোষ দেওয়া যায়না এখানে! তবে হ্যাঁ সাথে এটাও বলে রাখা উচিৎ যে নেহেরুর এই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিলো না। ভদ্রলোক প্রধানমন্ত্রী হবেন‚ এই ভেবেই আহ্লাদে আটখানা হয়ে ছিলেন। দিন পালটানোর কাজে সক্রিয় ছিলো মূলত বল্লভ ভাই প্যাটেলের লবি।

সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল‚ চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী প্রমুখ ব্যক্তিরা। গোহত্যা নিবারণ‚ সোমনাথ মন্দির পুনর্নিমান‚ RSS এর উপর থেকে ব্যান তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি যাবতীয় যা কাজ হিন্দুদের জন্য সেই প্রথম নেহেরু সরকার করেছিল‚ সবই এই প্যাটেল লবির চাপে পড়েই।

ইংরেজরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ১৫ই আগষ্ট মাঝরাতে

বেসিক্যালি হিন্দুদের জন্যে নেহেরু যে আদৌ যে কিছু ভাবতো ইতিহাস কিন্তু তার সাক্ষী দেয় না। বরং ১৯৫০-এর দশকে ভারত সফরে আসা ত্রিনিদাদের সাংসদ ড. শম্ভুনাথ কপিলদেব নেহেরু সরকারের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন ত্রিনিদাদের হিন্দুদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখা নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য।

তারপর সেই শম্ভুনাথ দ্বিতীয় RSS সরসংঘচালক এম. এস. গোলওয়ালকারের সাথে দেখা করেন। সেখান থেকেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তৈরির চিন্তা আরএসএস এর মাথায় আসে আর তারপর তো সে অনেককিছু! পরে অন্য একদিন সেই কথায় আসা যাবে। আজ মূল বিষয়ে থাকি।

তখন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসলেন, মাউন্টব্যাটেনের সাংবিধানিক উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে ভারত সচিব ভি. পি. মেনন।

তীক্ষ্ণবুদ্ধির এই আমলা খেয়াল করে দেখলেন‚ ইসলামী রীতিতে দিন শুরু হয় চাঁদ ওঠার সাথে সাথে সাথে (কারণ মরুভূমির প্রখর তাপ থেকে বাঁচার জন্যে আরবের মরুভূমির জীবন ছিলো চাঁদকেন্দ্রিক)! আবার‚ ভারতের সমস্ত হিসাবনিকাশ সূর্যভিত্তিক হওয়াতে হিন্দুদের দিন শুরু হয় ভোরে সূর্য ওঠার সাথে সাথে।

অর্থাৎ‚ সোজা ভাষায় বলতে গেলে মুসলিমদের জুম্মাবার শুরু হবে ১৪ই আগষ্ট রাত শুরু হওয়ার সাথে সাথে‚ অথচ হিন্দুদের পবিত্র বৃহস্পতিবার থাকবে ১৫ই আগষ্ট সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত!

আর এই হিসাবকেই সমস্যা সমাধানের জন্যে তুরুপের তাস বানালেন তিনি।

আলাপ আলোচনার পর ঠিক হল যে ইংরেজরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে ১৫ই আগষ্ট মাঝরাতে। অর্থাৎ‚ একইসাথে মুসলিমদের পবিত্র দিন জুম্মাবারে আর হিন্দুদের পবিত্র দিন বৃহস্পতিবারে।

অবশ্য মেনন শুধু ভারতীয়দেরই না। অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ব্রিটিশ জাতটিকেও। যেকোনো জাতির কাছেই তার দেশের পতাকা তার কাছে প্রানের থেকেও প্রিয় হয়‚ মাউন্টব্যাটেন সহ সমস্ত ব্রিটিশদের কাছেও তাই ছিলো।
আর মাউন্টব্যাটেনেরই উপস্থিতিতে‚ তারই পৌরহিত্যে তার মাতৃভূমির জাতীয় পতাকাকে নীচে নামিয়ে অন্য দেশের পতাকা তোলা হবে‚ আর নেহাতই কর্তব্যের খাতিরে এই কলঙ্কের ভাগীদার হতে মাউন্টব্যাটেন সহ অন্যান্য ব্রিটিশদের কিছুতেই মন থেকে সায় দিচ্ছিল না। মেনন তাদের কাছে সাক্ষাৎ দেবদূতরূপে এসে হাজির হলো।

অক্ষুন্ন থাকলো মাউন্টব্যাটেনের দেশপ্রেম

এমনিতেই সন্ধ্যের পর নিয়ম মেনে ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে রাখা হতো‚ মাঝরাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়ে গেলে পরেরদিন সকালে শুধু ইউনিয়ন জ্যাকের জায়গায় তেরঙ্গা পতাকা উড়বে। এতে তো আর অপমানের কিছু নেই!

আর এইভাবেই ভারতের স্বাধীনতা হয়ে গেলো ১৪ই আগষ্ট বৃহস্পতিবার‚ পাকিস্তানের ১৫ই আগষ্ট শুক্রবার‚ আর অক্ষুন্ন থাকলো মাউন্টব্যাটেনের দেশপ্রেম।

সে তো না হয় হলো।

কিন্তু এখন যে আমরা ১৫ই আগষ্ট ভারতের আর ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করি‚ সেটা কোত্থেকে আসলো তাহলে?

তেমন জটিল কিছুনা। বিশেষত ভারতের ক্ষেত্রে এটা হয়েছিলো ইউরোপীয় পদ্ধতিতে দিনের হিসাব ঠিক করার জন্য মধ্যরাতে দিন শুরু করা হতে থাকে। ইউরোপীয় পদ্ধতি ভালো পেডিগ্রির পদ্ধতি কিনা‚ প্রভুদের পদ্ধতি। এর সাথে নিজেদের মেলাতে পারলে বেশ একটা গর্ব গর্ব ভাব আসে। কি ছিনু‚ কি হনু টাইপ ব্যাপার আরকি।

আর ইউরোপীয় পদ্ধতিতে যেহেতু ১৫ই আগষ্ট রাত ১২ টার পর ভারতের স্বাধীনতা এসেছিল‚ তাই ভারতের স্বাধীনতা দিবস হয়ে গেল ১৫ই আগষ্ট‚ ১৯৪৭!

ইন্টারেস্টিং ঘটনা কি জানেন? স্বাধীন পাকিস্তানের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলো, “১৫ আগস্ট স্বাধীন এবং সার্বভৌম পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস।”
কিন্তু পরের বছর‚ অর্থাৎ ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান ১৪ই আগস্টকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করতে থাকে।

কারণ‚ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতটি ছিল ইসলামী রীতিতে রমজান মাসের ২৭ তারিখ। সাল ছিল ১৩৬৬ হিজরি। আর ২৭ রমজানের রাতটিকে মুসলমানরা পবিত্র রাত হিসেবে বিবেচনা করেন।

ফলে সেই দিনের সাথে মেলানোর জন্যে রাতারাতি স্বাধীনতা দিবসই পালটে দিলো তারা।

আর এভাবেই অখন্ড ভারতবর্ষের দুই অংশ‚ একটি অংশ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের লেজুরবৃত্তি করে স্বাধীনতা দিবস পালটে নিলো ১৫ই আগষ্ট আর অন্য অংশ আরবী সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় হয়ে স্বাধীনতা দিবস পালটে ফেললো ১৪ই আগষ্ট!

যেটাই আমরা সবাই বর্তমানে মেনে চলছি।

ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার দিন

ভারতের স্বাধীনতার আসল ইতিহাস

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

%d bloggers like this: