25 C
Kolkata
Sunday, September 25, 2022
বাড়িখেলাঅন্যান্যঅলিম্পিক ও আমরা ! সব মুহূর্ত আনন্দের হয় না

অলিম্পিক ও আমরা ! সব মুহূর্ত আনন্দের হয় না

নিজস্ব প্রতিবেদন- আজ সকালে টিভিতে অলিম্পিক (Olympics) দেখছিলাম। মহিলাদের শটপাট ছোঁড়ায় ব্রোঞ্জ পেলেন নিউজিল্যান্ডের ৩৭-বছর বয়স্ক অ্যাথলিট ভ্যালেরি অ্যাডামস। পাশে তখন সোনা ও রুপো জয়ী চিন ও আমেরিকার দুই অ্যাথলিট নানা ভাবে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ছবির জন্য পোজ দিয়ে নিজেদের খুশি প্রকাশ করছেন। ভ্যালেরিও খুশি, চেয়ারে বসে ব্যাগ হাতড়ে বের করলেন একটি ছবি, নিজের দুই সন্তানের। ওই ছবিতে চুমু খেয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাতে তাকাতে মুখে আনন্দের হাসিকান্না একাকার। তৈরি হল অলিম্পিক গেমসের আর একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।

অলিম্পিক তাই অন্তহীন কান্নার‌ও গল্প

বিশ্বের গ্রেটেস্ট শোতে এরকম মুহূর্ত তৈরি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, সব মুহূর্ত আনন্দের হয় না। বস্তুত, বেশিরভাগই উল্টো— ব্যর্থতার, স্বপ্নভঙ্গের। এই প্রতিযোগিতার ধরনটাই সেরকম। অল্প কয়েকজন যখন সাফল্যের আনন্দে উদ্ভাসিত, বাকিরা ব্যর্থতার অন্ধকারে ডুবে যান। শুধু তো মুহূর্তের পরাজয় নয়— তার সঙ্গে মেশা চার বছরের নিংড়ানো কিন্তু অর্থহীন পরিশ্রমের সেই হতাশাকে সামলানো কঠিন হয়, চোখের জল বাঁধ মানে না তাই, ‘অংশগ্রহণই বড় কথা’ বড়‌ই ছেলেমানুষি নিষ্ফল সান্ত্বনা। আবার, চোখের জল ছাড়া জেতেই বা কে? অলিম্পিক তাই অন্তহীন কান্নার‌ও গল্প। স্মরণীয় মুহূর্ত আর কান্নার হাজারো গল্পের মধ্যে এরকমই এক চিরস্মরণীয় কাহিনী ফিরে দেখব আজ।

বার্সেলোনা অলিম্পিক, ১৯৯২। পুরুষদের ৪০০ মিটার দৌড়ের সেমিফাইনাল। দৌড়বীরদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটেনের ডেরেক রেডমন্ড, তৎকালীন ফর্মের বিচারে পদকের অন্যতম দাবিদার। স্টার্টারের গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে স্টার্টিং ব্লক থেকে ছিটকে বেরোলেন প্রতিযোগীরা। ডেরেক পরে বলেছিলেন, সবার আগে বেরিয়েছিলেন উনিই। প্রথম ১৫০ মিটার এগিয়েছিল মসৃণভাবে, পরিকল্পনা মাফিক। তারপরেই তাল কাটল— ডান পায়ে যেন একটা বিস্ফোরণ, আর পরক্ষণেই এক তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেন ডেরেক, এতটাই যে পা চেপে ধরে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে গেছিল ওঁর।

আমাকে করতেই হবে

ছুটে আসেন অফিসিয়ালরা, আর তাঁদের পিছনে স্ট্রেচার নিয়ে রেড ক্রসের প্রতিনিধিরা। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ডেরেক যেন ওই স্ট্রেচার দেখেই ছিটকে উঠে দাড়ান। “নিজেকে বললাম”— পরে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— There’s no way I’m going to be stretchered out of these Olympics.’ আবার দৌড় শুরু করেন, অন্যদের চোখে যা ছিল এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলার করুণ চেষ্টা। অফিসিয়ালরা নিরস্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এই সময় ঘটল আরেক ব্যতিক্রমী ঘটনা। সব প্রতিরোধ এড়িয়ে দর্শকাসন থেকে এক ব্যক্তি পৌঁছে যান ডেরেকের পাশে, জড়িয়ে ধরেন তাঁকে। ব্যক্তিটি আর কেউ নন, ডেরেকের বাবা জিম।

তিনিও ছেলেকে বোঝান, ওভাবে রেস শেষ করার প্রয়োজন নেই আর। কাঁদতে কাঁদতে ছেলের জবাব, “আমাকে করতেই হবে।” ছেলের এক হাত নিজের কাঁধে নিয়ে এগোতে এগোতে জিম বলেন, “ঠিক আছে। চলো তবে আমরা দুজনে মিলে শেষ করি এই দৌড়।” অফিসিয়ালরা বারবার পিতাপুত্রকে অনুরোধ করেন ট্র্যাক ফাঁকা করে দিতে, লাভ হয়নি। “বাবাকে এত চার অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করতে কখনও শুনিনি। সেদিন বেশ কটা নতুন শিখলাম।”— ওই একই সাক্ষাৎকারে ডেরেকের স্বীকারোক্তি। ওভাবেই দু’জনে পৌঁছন ফিনিশিং লাইনে। না, একটু ভুল বললাম। ফিনিশিং লাইনে পৌঁছনোর ঠিক আগে বাবা ছেড়ে দেন তাঁর ছেলেকে। বলেন, *”যাও, এবার তুমি শেষ করো তোমার রেস।

জীবনের বড় রেসগুলো সবাইকে একাই শেষ করতে হয়

” জীবনের বড় রেসগুলো সবাইকে একাই শেষ করতে হয় যে” স্টেডিয়ামের পঁয়ষট্টি হাজার দর্শকের কেউ আর তখন নিজের চেয়ারে নেই, স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিয়ে তাঁরা বরণ করেছিলেন এই অভূতপূর্ব লক্ষ্যপূরণকে।

অনেক দূরে, ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটন শহরের বাড়িতে ডেরেকের মা জেনি টেলিভিশনে দেখছিলেন পুরো ঘটনাটা, চোখের জলে ভাসছিলেন তিনিও। পরে বলেছিলেন, ছেলেকে অত কষ্ট পেতে আর একবার‌ই দেখেছিলেন তিনি, ছ’বছরের জন্মদিনে চাওয়া সাইকেলটা না পেয়ে যেরকম হয়েছিল ডেরেকের। আর ডেরেকের বোন কারেন তখন ন’মাসের গর্ভবতী। ঘটনাটা দেখার পরেই ব্যথা শুরু হয় কারেনের, ছুটতে হয় হাসপাতালে, হয় প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি। জিম পরে বলেছিলেন, “তখন প্রতিটা পদক্ষেপে ওর চোট বেড়ে যেতে পারত। তবু ও যা করেছে, আমি তার জন্য গর্বিত। ডেরেক সোনা জিতলেও আমি এতটা গর্বিত হতাম না।” সেদিন বিকেলে অলিম্পিক ভিলেজে ফেরার সময় ওঁদের দেখা হয় ব্রিটিশ অ্যাথলেটিক দলের অধিনায়ক, কিংবদন্তী লিনফোর্ড ক্রিস্টির সঙ্গে।

ডেরেক আর লিনফোর্ড যে ঠিক সেরা বন্ধু ছিলেন না তা কোন‌ও গোপন কথা ছিল না। তীব্র বিরোধ ছিল দু’জনের। সেদিন দেখা হ‌ওয়ার পর ঠিক কী হয়েছিল? আবার উদ্ধৃত করি ডেরেককে— “It obviously touched something in him because he came over and put his arms round me and we embraced. Tear started and we both broke down. I know it sounds soppy but it was Mills and Boon sort of stuff. It shows that this sport isn’t just about coming here and making money.”

দু’বছর পর দু’জনে বিয়ে করেন

এখানেই শেষ করতে পারতাম, কিন্তু তাহলে সত্যিই দৌড়ের কাহিনিটা শেষ হবে না। তবে এর পরে আর কী কী হয়েছিল বলার আগে এর আগে কী হয়েছিল একটু বলি। ১৯৮৬-র কমন‌ওয়েলথ গেমসে নামতে পারেননি ডেরেক, ওই হ্যামস্ট্রিংয়ে চোটের জন্য‌ই। ১৯৮৮-র সিওল অলিম্পিকে হিটের কয়েক মিনিট আগে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়, টেন্ডিনাইটিসের সমস্যায়, দুটো পেইনকিলার ইঞ্জেকশনেও কাজ হয়নি। ক্রমাগত চোটের জন্য তার পরের বছর খেলা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন ডেরেক। সেখান থেকে তিন বছর পর বার্সেলোনার ওই ট্র্যাকে পৌঁছনো ছিল বারবার চোট পাওয়া কিন্তু হার-না-মানা অসম্ভব এক জেদ আর লড়াইয়ের গল্প। বার্সেলোনার ওই ঘটনার দু’বছর পর, অ্যাকিলিস টেন্ডনে এগারোতম অপারেশনের পর অ্যাথলেটিক্সে ডেরেকের কেরিয়ার আর এগোতে পারেনি। সার্জন বলেছিলেন, আর কোনও খেলাই সম্ভব হবে না।

তারপরও, অদম্য জেদে ভর করে ডেরেক গ্রেট ব্রিটেনের জাতীয় বাস্কেটবল দলে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন, আর সেই দলের একটা গ্রুপ ছবিতে স‌ই করে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন ওই ডাক্তারবাবুকে। প্রথম ডিভিশনে রাগবিও খেলেন, তবে একটুর জন্য জাতীয় দলে ঢুকতে পারেননি। বলা হয়নি, বার্সেলোনার ঘটনার পর ডেরেককে সহানুভূতি জানাতে এসেছিলেন ব্রিটিশ সাঁতারু শ্যারন ডেভিস, যাঁর নিজের‌ও ভালো যায়নি ওই অলিম্পিক (Olympics)। দু’বছর পর দু’জনে বিয়ে করেন, তবে ২০০০ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। তবে আরও বেশিদিন স্থায়ী হয়েছিল ডেরেকের ক্রনিক স্টমাক আলসারের সমস্যা— ক্রমাগত পেইনকিলার খাওয়ার কুফল। এখন ব্রিটেনের স্প্রিন্ট ও হার্ডলসের উন্নতিতে ভারপ্রাপ্ত দপ্তরের ডিরেক্টর এবং পাশাপাশি বিভিন্ন কর্পোরেট সেক্টরে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে কর্মরত ডেরেক তাঁর ভাষণে সবসময় ছোটদের তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেন তাই। বলা বাহুল্য, সেসব ভাষণের অন্য অনেকটা জুড়ে থাকে বার্সেলোনার সেই দিনের ঘটনা আর এক অদম্য লড়াইয়ের কাহিনী।

অলিম্পিক ও আমরা ! সব মুহূর্ত আনন্দের হয় না

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

%d bloggers like this: