25 C
Kolkata
Thursday, December 1, 2022
বাড়িসম্পাদকীয়সুভাষ হিটলার এবং তোজোর হাতের পুতুল

সুভাষ হিটলার এবং তোজোর হাতের পুতুল

নিজস্ব প্রতিবেদন- সুভাষ সমন্ধে এই বিষোদগার করতেও বিবেকে বাধেনি জওহরলালের। কখনও কি ভেবে দেখেছিলেন, একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে এ মিথ্যা প্রচার তাঁর ঠিক কিনা? একবারও কি ভেবেছিলেন ক্ষমতা লোভের আশায় বিবেক-বুদ্ধি বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়?

সুভাষ হিটলার : চমকে উঠল গোটা পৃথিবী!

ইতিহাস কথা কয়। ইতিহাসকে হাজার চেষ্টা করলেও মুছে ফেলা যায় না। তাই দেখা গেল জার্মানির মাটিতে নির্ভীক সেই সুভাষের তোজোদ্দীপ্ত রুপ। শোনা গেল পুরুষসিংহ সুভাষের গর্জন-“Hitlar is at liberty to lick British boots’. অর্থাৎ হিটলার ব্রিটিশের জুতো চাটতে পারে।
চমকে উঠল গোটা পৃথিবী! একী দুঃসাহসিক উক্তি! জার্মানির ভাগ্যবিধাতা মহাপ্রতাপশালী হিটলার সমন্ধে এ হেন উক্তি! ভাবলেও বুঝি রক্ত হিম হয়ে যায়।
কেন এই উক্তি?
কারন-এক বেতার-বক্তৃতায় ব্রিটিশের ভারত শাসনের সুখ্যাতি করেছেন হিটলার। আর সেই নাৎসি পার্টি সংবর্ধনা জানাবে সুভাষকে।
সুতরাং, নাl শত্রুর প্রশংসাকারীর কাছ থেকে কোনো কিছুই গ্রহনযোগ্য নয়। সুভাষের স্পষ্ট কথাl
হিটলার চিনলেন সত্যিকারের বীরের মতো এক বীরকে। চিনলেন রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে। চিনলেন আদর্শবান এক মহানায়ককে। চিনলেন সুভাষচ্ন্দ্র বোসকে।
তাই সঙ্গে প্রত্যাহার করে নিলেন বেতার-বক্তৃতা নিজের ভুল স্বীকার করে
এই হলেন সুভাষ। কোনো অবস্থা থেকে একচুল সরে আসতে রাজি নন তিনি।
সুভাষ ছাড়া গোটা দুনিয়ায় কার এ হিম্মত ছিল সেদিন জার্মানির মাটিতে দাঁড়িয়ে এমন কথা উচ্চারন করার?
ছিল কি পন্ডিত(?) জওহরলাল নেহেরুর?
আর একটা ঘটনাl “India for Indians.” ভারত, ভারতবাসীদের জন্য। এই কথার সমর্থন দাবি করলেন সুভাষ ত্রিশক্তির কাছে। জাপান, জার্মানি, আর ইতালির কাছে। সুভাষের বক্তব্য-ভারতের স্বাধীনতা সমন্ধে চাই ত্রি-পক্ষিয় ঘোষনা।
ইতালি আর জাপান তো মেনেই নিয়েছে। মুসোলিনির আন্তরিকতার প্রশ্ন ওঠে না। এমনকী তিনি হিটলারকে নিজে অনুরোধ জানিয়েছেন এই ব্যাপারেl আর তোজো তো ঘোষনা করেই চলেছেন “India for the Indians.”
কিন্তু জার্মানি? জার্মানি কী বলছে?
না, এরকম ঘোষনা করার উপযুক্ত সময় এখন নয়l যুদ্ধ পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল।
এদিকে সুভাষও ছাড়ার পাত্র নন। ভারত সমন্ধে ত্রি-শক্তির ঘোষনা চাই-ই। তিনি কি অকারনে দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার পেরিয়ে তরঙ্গ, তুষার ঝঞ্জা আর মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? চোখে তাঁর একমাত্র স্বপ্ন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা। তার চাই জাপান, জার্মানি আর ইতালির সমর্থন ও সহযোগিতা।
১৯৪২ সালের ২৮ মে। আলোচনায় বসেছেন সুভাষ আর হিটলার। একজন পরাধীন দেশের চির আশাবাদী অতুলনীয় বিপ্লবী-অন্য জন স্বাধীন দেশের সর্বেসর্বা। আলোচনা চলছে ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে। সুভাষের বক্তব্য-এ সমন্ধে চাই ত্রি-পক্ষিয় সুস্পষ্ট ঘোষনা। হিটলারের কথা যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য এখন তা সম্ভব নয়।
কেন সম্ভব নয়?
চলে নানা যুক্তি তর্কের অবতারনা। অবশেষে এক সময় বললেন হিটলার-হিজ্ একসেলেন্সি সুভাষচন্দ্র বোস, এরকম ঘোষনার রাজনৈতিক দিকটা ভেবে দেখবেন আশা করি।
রাজনীতি! রাজনীতি শিখতে হবে আমাকে হিটলারের কাছ থেকে! সঙ্গে জানালেন সুভাষ দোভাষী ভন ট্রটকে-“Tell His Excellency that I have been in politice all my life and that I don’t need advice from any side.”
একী বেপরোয়া জবাব! তা-ও আবার বিশ্বত্রাস হিটলারের একেবারে মুখের ওপর! এ যে ভাবা যায় নাl স্বপ্নেরও অগোচর।
এঁর নাম সুভাষচন্দ্র বোস। নির্লোভ, নির্ভীক নেতাজি-যিনি ক্ষমতালোভী ভীরু কাপুরুষ নন। পারেন কী এ হেন ভয়ডরহীন মানুষ কারওর হাতের পুতুল হয়ে নাচতে?
আর জাপানের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো নেতাজির প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ, অভিভূত। তিনি দেখলেন একজন সত্যিকারের মানুষের মতো একজন মানুষকে-দেখলেন নেতার মতো একজন নেতাকে-দেখলেন তোজোদ্দীপ্ত এক বীরকে-দেখলেন মহামান্য চন্দ্র বোসকে। বুঝলেন এ মানুষের কর্তব্য আর আদর্শ থেকে বিন্দু মাত্র টলানো সম্ভব নয়। কোনো কিছুর বিনিময়ে এ হেন মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করা যায় না। তাই প্রথম থেকেই নেতাজির প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধায় কনায় কানায় ভরে উঠেছিল মণিকোঠা। অমলিন ছিল সেই শ্রদ্ধা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। এর প্রমান টোকিওর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিচার-সভা। যতবার সেখানে নেতাজির নাম উঠেছে-ততবারই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে নেতাজির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি তোজো।
শুধু কি তাই?
নেতাজির প্রতিটি দাবি তিনি মেনে নিয়েছিলেন অন্তর থেকে।
আর নেতাজি?
কখনও কোনো ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে কোনো রকম চুক্তি করেননি জাপানিদের সঙ্গে। প্রমান সেদিনকার সেই শর্তাবলি।

সুভাষ হিটলার : নেতাজির স্বপ্নের অভিযান

সামনে ইম্ফল অভিযান। নেতাজির স্বপ্নের অভিযান। সেই অভিযান নিয়ে বৈঠক শুরু হল জাপানিদের সঙ্গে। গৃহীত হল সিধান্ত। কী-কী শর্তে উভয়পক্ষ একমত হয়েছিল সেদিন? স্পষ্ট হয়ে উঠবে সবকিছু বিশেষ কয়েকটি শর্তের দিকে নজর দিলে-
*”The two armies would work on a common strategy.
* Officer and the man of Azad Hind Fouj would be under their own military law (The I.N.A. Act) and not under the Japanese military law and police.
* Liberated territories were to be handed over to Azad Hind Fouj.
* The only flag fly over the Indian soil would be Nationla Tri-Colour.
* Any Japanese or Indian soldier found looting or raping any woman was to be shoot at ones.’

লালকেল্লায় ঐতিহাসিক বিচারের সময় আজাদ হিন্দ্ সরকারের পক্ষ সমর্থন করে এর মর্মার্থ তুলে ধরেছিলেন বিখ্যাত আইনবিদ ভুলাভাই দেশাই।
তাঁর নিজের কথাঃ
“I have attempted to prove and I have established that I.N.A. though smll in numbers, was fighting as allies of the Japanese army and there is no ignorance in admitting that or doing that, because the objectives at the time of both the armies were undoubtedly to free India from Britain”
তিনি আরও বলেছেন;
“According to their agreement which I submit, I have proved, any part of Indian territory whice may be liberated should be immediately handed over to I.N.A. …. Where is the question of being an instrument?”
কোনো ক্ষেত্রই ক্ষুণ্ণ করেনমি ভারতবর্ষের জাতীয় মর্যাদা। নাচেননি তোজোর হাতের পতুল হয়েও।
আর এক ঘটনাl সমস্যা দেখা দিল পারস্পারিক নিয়ে। কে কাকে আগে অভিবাদন জানাবে আমাদের।
-তা কেন? এক কথায় মীমাংসা করে দিলেন নেতাজি, একই সঙ্গে দুপক্ষ দুপক্ষে অভিবাদন জানাবে
মেনে নিল জাপাল নেতাজির কথা
৫ নভেম্বর, ১৯৪৩ শুরু হল বৃহত্তর পূর্ব এশিয়া সম্মেলন। সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছে জাপ প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো।
দর্শক হিসাবে সেখানে উপস্থিত নেতাজি ও তার সহতর্মীl
সভপতির ভাষনে তোজো বললেন-এশিয়া এশিয়াবাসীদের জন্য। দিনের পর দিন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ আর বন্ধু আমেরিকা শোষণ করে চলেছে এশিয়াকে। এখন থেকে আমরা আর তা হতে দেব না। ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসছে সাম্রাজ্যবাদীদের বজ্রমুষ্ঠি। এশিয়ার অনেক দেশ আজ স্বাধীন গয়েছে এবং ভবিষ্যতে বাকি সব দেশ স্বাধীন হবেl আটত্রিশ কোটিঅধিবাসীর ভারতবর্ষ এশিয়ার অন্যতম বৃহত দেশ। সেই ভারতবর্ষের মুক্তি আসন্নl নেতাজি এই মুক্তি সংগ্রামের পরিচালক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস-নেতাজির এই মহৎ প্রয়াস সফল হবেই। অচিরেই ভারত স্বাধীন হবেl আর স্বাধীন ভারতের কর্ণাধার রূপে নেতাজি সেই দেশকে গড়ে তুলবেন। গড়ে তুলবেন সমৃদ্ধশালী সুজলা সুফলা এক নতুন ভারত।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানালেন নেতাজি। মাননীয় সভাপতির উচিত ওই কথা প্রত্যাহার করাl আমার দায়িত্ব শুধু ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা। এর বেশি কিছু নয়। স্বাধীন ভারতে রাষ্টপ্রধান কে হবেন না হবেন সে দায়িত্ব ভারতবাসীর। সে কথা বলার অধিকার কেবলমাত্র তাঁদেরই- অন্য কারোর নয়। এ ব্যাপারে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ আমি নিষ্প্রোয়োজন মনে করি।
সলজ্জ তোজো প্রত্যাহার করে নিলেন তাঁর উক্তি নিজের ভুল স্বীকার করে।
এই হল জাপানিদের মহামান্য “চন্দ্র বোস”। যাঁকে তাঁরা বসিয়েছিলেন বীরের আসনে। অন্তর থেকে করতেন শ্রদ্ধাl সমীহ করে চলতেন প্রতিনিয়ত।
“The Japanese respected and courage they certainly found in Bose”
এ হেন বেপরোয়া নির্ভীক মানুষটি নাকি তোজোর হাতের পুতুল! এ কি ভাবা যায়, না ভাবা উচিত!

সুভাষ হিটলার এবং তোজোর হাতের পুতুল

সুভাষ হিটলার এবং তোজোর হাতের পুতুল

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

%d bloggers like this: