25 C
Kolkata
Sunday, December 4, 2022
বাড়িবিনোদনবাংলা ভাষার সঙ্কটে বাঙ্গালী! স্বর্গীয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর বক্তব্য থেকে

বাংলা ভাষার সঙ্কটে বাঙ্গালী! স্বর্গীয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর বক্তব্য থেকে

বাংলায় বাংলা ভাষার যে সংকট আছে তা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। বাঙালি আজ তার নিজের ভাষা ভালো করে শিখছে না, বলছে না, ব্যবহার করছে না। এর উৎসটা কোথায় সেইটে ভাবার চেষ্টা করা বোধহয় ভালো। সেটা ভাবতে গেলে আমার কীরকম জানি মনে হয়, সংকটটা আসলে মূল্যবোধের সংকট । যে মূল্যবোধ থেকে মানুষ তার জীবনযাত্রা নির্বাহ করে, একটা সমাজ পরিচালিত হয়, সেই সব মূল্যবোধের জায়গাতেই বিরাট কতগুলো ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মূল্যবোধের মধ্যে একটা বড় জিনিস থাকে, সেটা হচ্ছে —– নিজেকে বোঝা, নিজেকে খোঁজা, নিজেকে উপলব্ধি করার একটা মন সক্রিয় থাকে। সেই মন থেকেই সে বুঝতে পারে বাকি পৃথিবীর সঙ্গে তার সম্পর্ক কোথায়, তার অবস্থানটা কোথায়। সেই দিক থেকে বাঙালির আত্মপরিচয়ের একটা সমস্যা বহুদিন থেকেই তৈরি হয়েছে।

বাংলা ভাষা : বাঙালি যেন ভুলে গেছে তার আত্মপরিচয়

বাঙালি যেন ভুলে গেছে তার আত্মপরিচয়, তার ঐতিহ্য। এই শিকড়হীনতার কারণেই বাঙালি বুঝতে পারে না তার ভবিষ্যৎ। তাই থেকেই বাঙালির মধ্যে ভয়ংকর রকম বেশি পরামাণে আছে অনুকরণপ্রিয়তা। বাঙালি এক সময় সাহেবদের অনুকরণ করতো, এবং এখন যারা দিল্লিশ্বর তাদের অনুকরণ করছে। অর্থাৎ তাদের ভাষা, তাদের সংস্কৃতি যখন চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তখন বাঙালির এমন কোনও শক্ত মূল্যবোধের ভিত নেই যার দ্বারা সে এই চাপিয়ে দেওয়া ভাষা – সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি এবং নিজের জাতিগত অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারে ।

কলকাতায় যে সমস্ত সিনেমা হল রয়েছে, তার মধ্যে একটি মাত্র চেইনই এখন বাংলা ছবির জন্য অবশিষ্ট আছে। মানে মাত্র তিনটি প্রেক্ষাগৃহ। বাকি সব জায়গায় হিন্দি ছবিই চলে। কোনও ভাষার বিরুদ্ধে আমার কোনও রাগ নেই । কিন্তু আমার ভাষাকে যদি কেউ উচ্ছেদ করতে আসে, রুখে দাঁড়াতেই হয়, কলকাতা দূরদর্শনেই বা আমরা কতটুকু বাংলা দেখতে পাই ? সেখানে হিন্দির যে দৌরাত্ম তা তো সাম্রাজ্যবাদী চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে বহু বছর ধরেই। এবং এইভাবে বাঙালিকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও বাংলার সংস্কৃতির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার উপর একটা অবক্ষয়ী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার ষড়যন্ত্র চলছে । এসব কেন মেনে নেওয়া হচ্ছে ?

গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন চর্চার মধ্যে আজও বাংলার সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়

এক্ষেত্রে সেই মূল্যবোধটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, যে মূল্যবোধ থেকে একজন মানুষ তার নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকে । একটা পরিবার তার পারিবারিক গৌরবকে মনে রাখে, একটা পল্লি, একটা মহল্লা এমনকি একটা বৃহত্তর সমাজ নিজেদের গোষ্ঠীর যে ঐতিহ্য তাকে সাদরে বহন করে নিয়ে চলে । বাঙালির জাতীয় জীবনে মূল্যবোধের এই সংকটাই আসল । এটা বহু দীর্ঘদিন ধরে ঘটছে । আজকে এই সংকট এবং চাপের মধ্যে বাংলা ভাষার দিকে মুখ ফেরানো, বাংলা বলা যেমন একটা আশু কর্তব্য, অন্যদিকে সমগ্র বাঙালি জাতির নিজের দিকে মুখ ফেরানো আরও বেশি জরুরি। এবং এই মূল্যবোধ আজও যেখানে জেগে আছে ঠাকুমা দিদিমাদের মতো প্রাচীনদের মধ্যে, সর্বোপরি বেশি করে গ্রাম বাংলায়।

যদিও এই বিষাক্ত বাতাস সেখানেও পৌঁছে গেছে, তবুও সেখানেই গরিষ্ঠ বাঙালি বাস করেন । গ্রাম বাংলার মানুষের জীবন চর্চার মধ্যে আজও বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি প্রাধান্য পায় ।‌ তাই তাদের দিকে মুখ ফেরালে হয়তো আমরা একটা পথের নির্দেশ পেতে পারি ।‌ যেহেতু অনেকরকম কাজের মধ্যে তাদের ভাষাকে নিয়ে যেতে হয়,‌সেই কারণে তাদের মুখের ভাষা এখনও কলকাতা শহরবাসীর মধ্যবিত্ত বাঙালির ভাষা থেকে অনেক বেশি ঐশ্বর্যশালী ভাষা।

একটা ফসল বুনতে গেলে কয়েকশ এমন শব্দ তাদের ব্যবহার করতে হয়, যা শহরবাসী মধ্যবিত্ত বাঙালি জানেই না। শহরবাসী বাঙালি মধ্যবিত্ত ক’টা বাংলা শব্দ ব্যবহার করে সারাদিনে ? সকালে ঘুম থেকে উঠে, এই চা দাও, বাজারটা করে আনি । তারপর ট্রামে – বাসে, ঠেলছেন কেন ? অফিসে বড়বাবু কী হলো? এই তো তার বাংলা শব্দের পুঁজি।

এছাড়া সে আর যে বাংলা শব্দ ব্যবহার করে, তা হলো খবরের কাগজ থেকে শেখা নপুংশক কতগুলো বাংলা । সেইজন্যই বলছি, বাঙালি নিজের দিকে ফিরুক, নিজেকে চিনতে শিখুক, নিজের বিস্মৃতির থেকে বেরিয়ে আসুক । এইটেই বোধহয় বাঙালির সংকটের মুক্তির রাস্তা ।

বক্তাঃ চলচ্চিত্র জগতে বাংলা ভাষাটাকে সবচেয়ে ভালো উচ্চারণ করতেন যিনি শ্রী সৌমিত্র চ্যাটার্জি।

বাংলা ভাষার সঙ্কটে বাঙ্গালী!

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

%d bloggers like this: