25 C
Kolkata
Thursday, December 1, 2022
বাড়িরাজ্যজেলানন্দীগ্রাম, এক পরিবর্তনের কান্ডারী!

নন্দীগ্রাম, এক পরিবর্তনের কান্ডারী!

নিজস্ব সংবাদদাতা, অর্পিতা মন্ডল- সালটা ২০০৭…’নন্দীগ্রাম’ ।
১৪ই মার্চ ঘটে গিয়েছিল সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা।আদৌ কি দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু। চলুন ফিরে দেখা যাক আর একবার।

নন্দীগ্রাম,যাকে বাংলার রাজনীতির সর্ব শ্রেষ্ঠ অস্ত্র বলা যেতেই পারে। তৎকালীন বিরোধী দলের তৃতীয় নেত্র হয়ে গেল এই নন্দীগ্রাম। নন্দীগ্রামে জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাংলায় হঠাৎ পরিবর্তনের ঝড় তীব্র গতিতে ধেয়ে এলো। এককথায় বলা যায়, সিঙ্গুর আন্দোলনের পর নদীর বিপরীতে বয়ে যাওয়া তৎকালীন বাম সরকারে কফিনে নন্দীগ্রাম আন্দোলনই শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়েছিল বলে মনে করে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ঠিক চোদ্দ বছর আগে আজকের দিনে অর্থাৎ ২০০৭ এর ১৪ মার্চ, নন্দীগ্রামে জমি বিক্ষোভে পুলিশের অনিয়ন্ত্রিত গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। সালিম গোষ্ঠীর কেমিক্যাল হাবের জন্য ১৪,০০০ একর জমি নিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল।দেশ জুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। মারামারি, আন্দোলন, অনোশন কি হয়নি সেই সময়। খবরের পাতায় পাতায় কেবলই নন্দীগ্রাম। কলকাতা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু কোরে নন্দীগ্রামের ঘটনায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয় । এরপর আর পিছন ফিরে দেখতে হয়নি তৎকালীন বিরোধী দল নেত্রী তথা বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস এর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে। অবশান হয় বাংলার ৩৪বছর ধরে শাষন করে আসা বাম আমলের। নন্দীগ্রামের ঘরে ঘরে সন্ধ্যে প্রদিপের মতো জ্বলতে শুরু করলো পরিবর্তনের শিখা।


কিন্তু তারপর??? আসুন দেখি বর্তমান কি বলছে?

হরিপদ মণ্ডল,জমি অধিগ্রহণের জন্য সেই সময় সেই সময় তৈরি হওয়া ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য ছিলেন এই ভাগচাষি হরিপদ মণ্ডল। আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “জমি অধিগ্রহণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা কী পেলাম ? তৃণমূলের রাজনৈতিক লড়াইয়ে আমাদের ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।নন্দীগ্রামের মানুষ বিচার পায়নি”। এইরকমই এক ব্যক্তি রবীন মণ্ডল। গত দশ বছর ধরে প্রতিদিন তৃণমূল সরকারের তৈরি করা শহিদ বেদীতে যান তিনি। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল রবীন মণ্ডলের বাবা বাদল মণ্ডলের। তিনি বলেন, “তৃণমূল সরকার আমাদের চাকরি দিয়েছে, ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। কিছু পরিবার সরকারি চাকরিও পেয়েছে। কিন্তু চাকরি বা ক্ষতিপূরণ কোনওটাই আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না, বা শান্তি দিতে পারবে না”। তাঁর কথায়, “বিচারের কী হল, ঘটনায় জড়িত পুলিশ আধিকারিক এবং রাজনৈতিক নেতাদের শাস্তির কী হল”? আরও একজন ব্যাক্তি গোবিন্দ দাস ছিলেন নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে মৃতদের তালিকায় ।তার ভাইপো বিকাশ দাস বলেন, পুলিশ আধিকারিকদের কারও শাস্তি হল না, স্থানীয় কিছু সিপিআইএম নেতা, যাঁরা এই ঘটনায় যুক্ত ছিলেন, হয় তাঁরা শাসকদল তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, নাহলে প্রধান বিরোধী বিজেপিতে। তিনি বলেন, “অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছুই হয় নি। তাঁদের তো স্পর্শও করা হয় নি, বরং সেই সমস্ত পুলিশ আধিকারিকদের পদোন্নতি দিয়েছে তৃণমূল সরকার”।

গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত ১৪টি পরিবারের সদস্যদের মুখে একই কথা শোনা গেল।নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল রাখাল গিরির।তাঁর এক আত্মীয় বললেন, “আমরা রিপোর্ট পড়েছি, চার্জশিটে অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের নাম দিতে চেয়েছিল সিবিআই, কিন্তু বাধা দিয়েছে তৃণমূল সরকার। তার কথায়, “এটা শুধুমাত্র তৃণমূলকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। ক্ষমতায় আসার পর বিচার নিয়ে তারা চিন্তিত নয়”।

ঘটনার একদশকেরও বেশী সময় পর তৃণমূলের প্রতি মোহভঙ্গ হয়েছে সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির। তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের পদোন্নতি দেওয়া এবং সিপিআইএম নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে তারা।

ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটিকে সমর্থন জানিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দল ক্ষমতায় আসার পর সেই কমিটির বেশীরভাগ সদস্যই তৃণমূলে যোগদান করেন।রাজ্যের শাসকদলের বক্তব্য,যেহেতু বিষয়টি নিয়ে সিবিআই তদন্ত করছে, সেই কারণে তাদের বেশী কিছু বলার নেই, তবে আইন আইনের পথেই চলবে। তমলুকের তৃণমূল সাংসদ দিব্যেন্দু অধিকারী বলেন, “আমরা ক্ষোভ বুঝি, কিন্তু বিষয়টি আদালতের হাতে এবং তদন্ত করছে সিবিআই। আমাদের সরকারের এ নিয়ে কিছুই করার নেই”। অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করেন নি তিনি।

তৃণমূলের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামের এবং বাংলার মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ।তিনি বলেন, “চলতি নির্বাচনেই এর মোক্ষ জবাব পাবে তৃণমূল”।

সিপিএম নেতৃত্বের অভিযোগ, তৃণমূলের, মানুষকে ভুল বোঝানোর নীতি প্রকাশ্যে চলে এসেছে।সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, “সিঙ্গুর হোক, বা নন্দীগ্রাম, নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে মানুষকে ভুল বুঝিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু তারা সবসময় সব মানুষকে বোকা বানাতে পারবে না। মানুষকে ভুল বোঝানোর ফল পেতে হবে তৃণমূলকে”।

মনে পড়ে যাচ্ছে চার বছর আগের বাংলা ছায়াছবি “কানামাছি”র কথা। আশাকরি, আর কিছুই বলার অপেক্ষা রাখে না।

আপনার মতামত দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

%d bloggers like this: